দুটি অণুগল্প :
অমিত মাহাত
এক
সনাতনের লাশ
পরশুর পর আজ।
পরশুর সেই পুরনো জায়গা জুড়ে কয়েকটা পোস্টার। পোস্টার গুলো লাশটার চারপাশে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তারমধ্যে একটি আবার লাশের বুকে সাঁটানো। ওতে লেখা- চরম শাস্তি!
পিছমোড়া বাঁধা মুখ থুবড়ে পড়া সময়, যে নিজেই একটা লাশ। দিনের আলো লাশ গুলোকে চেনায়। রাতের অন্ধকার গর্ভদাত্রীর মতো। অব্যক্ত যন্ত্রণায় ধড়ফড় করে। শুয়ে শুয়ে কাতরায়। কখন সকাল এসে নাড়ি কাটবে মা ও ছেলের।
লাশ হবার আগে -সে ছিল সনাতন মাহাত। শাল মহুলের ছায়ামাখা বনতলা ছিল সনাতনের গাঁ। মরচে ধরা টিনের ছাউনি দেওয়া বসত বাড়ি। যা সনাতনের মতোই নড়বড়ে। আর ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিঘা তিনেক ধান জমি। এক ফসলি। হাড় পাঁজরা সার হাল গরু। শালপাতা সেলাই করা বউ। বছর দশেকের একটি ছেলে এবং ছিল এককুড়ি পনেরো বছরের শ্বাসবায়ু।
বাঁধা গতের বাইরে বেরতে নারাজ বরাবরের সনাতন।। কিন্তু শাল মহুলের দেশ ওলট পালট করে দিল সবকিছু। বিদ্রোহী হয়ে উঠল বনমহল। বারুদ পোড়া গন্ধে শালফুল ঝলসে গেল। মহুলের নেশা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
তার পর কে যেন...
কে যেন চিনিয়ে দিল, ওই তো। ময়লা রঙের লোকটা! সনাতন মাহাত!
তখন বাতাসে ভেসে উঠল গালি-নিমকহারাম! ছিঃ ছিঃ করে উঠল রক্তমাখা শালপাতা। লালমাটির ভেতরটা ডুকরে উঠল আরেকবার।
লালকালিতে লেখা কয়েকটা পোস্টার উড়ে এল বিষাক্ত পোকার মতো। তা দেখে, আঁতকে ওঠা ভয়ের মতো প্রশ্ন করেছিল কানাঘুষো হাওয়ায়। লালকালির লেখাগুলো আলতা ছিল?কান্নামাখা সিঁদুর ছিল কি?নাকি নিজেরেই রক্তে লেখা ওগুলো?
দুই
ডাহি
বনভূঁয়ের বনকচা গাঁ। হেঁদি যখন পহিল আইস্যেছিল ইগাঁয়ে। তখন পিঁদাড়লে বন। ডেহইরলে লাটা। পা অলমালে খারাং শুঁগায় হুগাত।লুগায় লটকিলে উঠতেও কুঁচাত। বইসলেও কুঁচাত। আর চইললে ত কুঁচাতই।
হেঁদি তখন লইতন বহু। গাঁয়ের গটা বাখুলের বহু বিটি উয়াকে লইতন কাপড়ের পারা নিখরাত। ইঁচরাত। অলমাত। অ লো ই বহুটা ক্যামন পারা বঠে! ভাল ইইমা! নাকটা বুচা। আলতা লেসড়ানা ফাটা এড়ি।
মরদ ই'বন উ'বন ঢনকিত। গুঁড়চা, প্যাঁড়চা, কপতি খেড়া রগদাত। হাটবারে হাট যাত্য ভুগা সাঁটে। সাঁঝে ত ভাকুত্যালে দমতক মাতাল। মাতলাহা মরদ তখন হেঁদিকে বইলত্য,বহু ইবারেও পইসায় আঁটাইল নাই। শালা! খাতেই ভাত নাই আর অ হ্যাঁজড়াব। শাউড়ি বইলত্য, -ই বহু বেড়ে থতনা লাড়া। মু বাজালে খুঁধায় দাঁত ভাঙে দিব। দুধের ছুয়া তখন টুটি ফাড়ত। দুধ নাই। হেঁদির থন শুকা। মাড় পানি বাসির বাসি। পোঁদ আমসি।
তা বাদে শাউড়ি টা টিঁড়গিল। মরদটাও বনেই দাঁত গিজড়ে মইরল্য।
বন বইলত্যে হিঁয়া মটা শাল মহুল। কেঁদ। এখন কন অ নাই। ঠুঁটমরা। উদমা ডাহি আর খারাং বুদা। বেধুয়ামড়া পোঁদে হুগছে।
বাংলা অর্থ :ডাহি -শুকনো ভূমি। পিঁদাড় -ঘরের পেছন দিক, ডেহইর -উঠোন, লাটা -ঝোপঝাড়, খারাং- নল জাতীয় ঘাস (ঝাঁটা বোনা হয়), হুগাত -ফুটত, নিখরাত -নিখুঁত ভাবে দেখত, ইঁচরাত-অগোছালো করত, অলমাত- আলগা করত, নাক বুচা -চ্যাপ্টা নাক, এড়ি -গোড়ালি,গুঁড়চা-কাঠবেড়ালি, পাঁড়চা- পায়রা জাতীয় বুনো পাখি, খেড়া- খরগোস, ভুগা-জাং বরাবর খাটো ধুতি, ভাকুত্যাল-মহুয়া মদ, আঁটাইল-কুলালো, হ্যাঁজড়া -উচ্ছিষ্ট, থতনা লাড়া -ঝগড়াটে,খুঁধায়-কিল সহযোগে, টুঁটি ফাড়ত-চিৎকার করত, কান্না কআটি, থন- স্তন, আমসি-শুকনো,টিঁড়গিল -শিরায় টান ধরে যাওয়ার ফলে মৃত্যু,দাঁত গিজড়া -দাঁত বের করে ভয়ঙ্কর মৃত্যু, বেধুয়ামড়া -যার জন্মের পরিচয় পাওয়া যায়নি (গালি অর্থে)।